ভগবত গীতা

ফরম্যাট — বইর মতো HTML পেজ • ভাষা — বাংলা •

অংশ ১ — সূচনা ও দ্বিতীয় অধ্যায়

ওম নমো ভগবতে বাসুদেবায়। জয় শ্রীকৃষ্ণ। রাধে রাধে।

মানব জীবনের গভীরতম প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, যুগে যুগে নানা ধর্মগ্রন্থ, দার্শনিক তত্ত্ব, ঋষি-মুনি ও মহাপুরুষেরা মানুষকে আলোর পথে পরিচালিত করেছেন। কিন্তু কিছু শিক্ষা আছে যা সময়ের সীমা অতিক্রম করেও আজও তেমনি প্রাসঙ্গিক, জীবন্ত ও অনন্ত সত্য হিসেবে বিরাজমান। শ্রীমদ্ ভগবত গীতা সেই মহাগ্রন্থ, যেখানে জীবনের উদ্দেশ্য, কর্তব্য, ধর্ম, জ্ঞান, ভক্তি ও যোগ—সব কিছুর এক চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে।

হাজার হাজার বছর আগে, কুরুক্ষেত্রের বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের মধ্যে যে অমর সংলাপ হয়েছিল, তাই আজ আমাদের কাছে “গীতা” নামে পরিচিত। কিন্তু এটি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের কাহিনী নয়—এ এক অন্তরের যুদ্ধের প্রতীক। প্রতিটি মানুষের ভেতরেই চলে এই যুদ্ধ—কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়, কোন পথে গেলে সত্যিকার মুক্তি পাওয়া যায়—এই দ্বন্দ্বেই জীবন। অর্জুন সেই সাধারণ মানুষের প্রতিরূপ, যে দায়িত্ব ও ধর্মের মুখে দাঁড়িয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়, ভয় পায়, নিজের দুর্বলতার কাছে হার মানে। আর কৃষ্ণ সেই চিরন্তন পথপ্রদর্শক, যিনি মানুষকে অন্দকার থেকে আলোয়, বিভ্রান্তি থেকে সত্যের দিকে নিয়ে যান।

কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে দুই সেনা—কৌরব ও পাণ্ডব—মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। কিন্তু এ যুদ্ধ কেবল রাজ্য বা সিংহাসনের জন্য নয়, এটি ধর্ম ও অধর্মের সংঘর্ষ, ন্যায় ও অন্যায়ের চূড়ান্ত সংঘাত। যখন যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে, তখনই অর্জুন তার প্রিয়জন, আত্মীয়স্বজন, গুরুজনদের বিপরীত শিবিরে দেখে। তার হৃদয় কেঁপে ওঠে, ধনুক হাত থেকে প্রায় পড়ে যায়, শরীর শীতল হয়ে আসে। মনে হয়—এই যুদ্ধ সে কোনোভাবেই করতে পারবে না। সে কৃষ্ণকে বলে, “আমি যুদ্ধ করব না।” এখান থেকেই শুরু হয় গীতা।

শ্রীকৃষ্ণ ধীরে ধীরে অর্জুনকে বোঝাতে শুরু করেন। তাকে নিজের কর্তব্যের পথে স্থির করতে চান। গীতার প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখি—অর্জুনের গভীর বিষাদ, তার ভেতরের দ্বিধা ও মানসিক অস্থিরতা। আর দ্বিতীয় অধ্যায় থেকেই কৃষ্ণের জ্ঞানধারা প্রবাহিত হতে থাকে।

কৃষ্ণ জানিয়ে দেন—দেহ নশ্বর, কিন্তু আত্মা অমর। যে দেহের মৃত্যুকে আমরা এত ভয় পাই, সেটি কেবল এক বাহন, এক সাময়িক আবরণ। আত্মা জন্ম নেয় না, মরে না—সে চিরন্তন, অবিনশ্বর ও অপরিবর্তনীয়। এই সত্যটি উপলব্ধি করলে, শোক করার কোনো কারণই থাকে না।

কৃষ্ণ বলেন—মানুষের ধর্ম হচ্ছে নিজের কর্তব্য পালন করা। ফলের চিন্তা না করে, আসক্তি ত্যাগ করে কাজ করা উচিত। এটাই কর্মযোগের মূল শিক্ষা—“কাজ করতেই হবে, কারণ কর্ম ছাড়া জীবন চলে না।” কিন্তু সেই কাজ যেন নিজের স্বার্থে না হয়, বরং বৃহত্তর কল্যাণের জন্য হয়। তবেই সেই কর্মই যোগ হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় মানুষ স্থিরচিত্ত হয়, অন্তরে শান্তি আসে।

অর্জুন তখনও দ্বিধাগ্রস্ত। সে বলে—“আমি কীভাবে আমার গুরু, ভাই, আত্মীয়দের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলব? তাদের হত্যা করার চেয়ে দারিদ্র্যে জীবন কাটানো ভালো।” কৃষ্ণ তখন তাকে বোঝান—“এই দুর্বলতা তোমার আসক্তি থেকে জন্ম নিয়েছে। মনে রেখো, দেহ নশ্বর কিন্তু আত্মা অক্ষয়। যারা দেহ ধারণ করেছে, তাদের মৃত্যু একদিন হবেই। আজ না হোক কাল, সবাইকে এই পৃথিবী ছাড়তে হবে। তুমি যদি নিজের কর্তব্য থেকে পিছিয়ে যাও, তবে সমাজ তোমাকে কাপুরুষ বলবে। অপমানের ভারে তুমি মুক্তি পাবে না।”

দ্বিতীয় অধ্যায়ে কৃষ্ণ যে জ্ঞান দেন, তা গীতার অন্যতম মূল শিক্ষা। তিনি বলেন—সেই মানুষই যোগী, যে সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, জয়-পরাজয়—সবকিছুকে সমভাবে দেখে। স্থিতপ্রজ্ঞ সেই ব্যক্তি, যার মন বাইরের পরিবর্তনে নড়ে না, অন্তরে থাকে শান্ত ও স্থির। অর্জুনকে কৃষ্ণ শেখান—মনকে জয় করতে হবে, দ্বন্দ দূর করতে হবে, আত্মাকে চিনতে হবে। জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তি—এই তিনের সমন্বয়েই জীবন পূর্ণ হয়।

অংশ ২ — তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ অধ্যায়

দ্বিতীয় অধ্যায়ের জ্ঞান অর্জুনের অন্তরে আলো জ্বালালেও, তার সংশয় পুরোপুরি কাটে না। তখন শ্রীকৃষ্ণ আরো গভীরভাবে বোঝাতে শুরু করেন — কাজ, জ্ঞান, ভক্তি ও যোগ—এই সবই মুক্তির পথে পরস্পরের পরিপূরক।

তৃতীয় অধ্যায় – কর্মযোগ

কৃষ্ণ বলেন—“জগতে কেউ কর্মহীন থাকতে পারে না।” প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি পদক্ষেপই এক একটি কর্ম। কিন্তু মানুষকে বন্ধনে জড়ায় আসক্তি—ফলের প্রতি আকাঙ্ক্ষা। যদি কেউ কাজ করে ঈশ্বরকে উদ্দেশ্য করে, ফলের প্রতি লোভ ত্যাগ করে, তবে সেই কর্মই মুক্তির পথ হয়ে ওঠে।

কৃষ্ণ উদাহরণ দেন—যেমন সূর্য, বাতাস, নদী তাদের কাজ অবিরাম করে চলে, বিনিময়ে কিছুই প্রত্যাশা করে না। তেমনি মানুষকেও নির্লিপ্তভাবে, নিঃস্বার্থভাবে নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে। অর্জুন তখন প্রশ্ন করে—“যদি জ্ঞানই মুক্তির পথ হয়, তবে কর্ম কেন করব?”

কৃষ্ণ উত্তর দেন—“জ্ঞান ছাড়া কর্ম অসম্পূর্ণ, আর কর্ম ছাড়া জ্ঞান নিষ্ক্রিয়। দুটো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। যেমন আগুন আর তাপ আলাদা হতে পারে না, তেমনি জ্ঞান আর কর্মও একে অপরের পরিপূরক।” তিনি বলেন—“কর্ম থেকে পালানো মুক্তি নয়; কর্মকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করাই মুক্তি।”

চতুর্থ অধ্যায় – জ্ঞানযোগ ও ঈশ্বরের অবতারত্ব

এই অধ্যায়ে কৃষ্ণ নিজেকে প্রকাশ করেন তাঁর দিব্য রূপে। তিনি বলেন—“যখনই পৃথিবীতে ধর্মের অবনতি ঘটে এবং অধর্ম বৃদ্ধি পায়, তখন আমি অবতীর্ণ হই—সাধুদের রক্ষা, দুষ্টদের বিনাশ এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য।” তিনি জন্ম নেন না, কারণ তিনি চিরন্তন; তবু মানবকল্যাণের জন্য বারবার অবতার গ্রহণ করেন।

এই বাণী শুনে অর্জুন ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে—এই কৃষ্ণ কেবল বন্ধু বা রথচালক নন, তিনি স্বয়ং ঈশ্বর। কৃষ্ণ বোঝান—যারা সত্যকে জানে, তারা বোঝে কর্মফল কীভাবে জ্ঞানের আগুনে ভস্ম হয়ে যায়। যেমন আগুনে কাঠ পুড়ে ছাই হয়, তেমনি জ্ঞানের আলোকেই পাপ ও বন্ধন নাশ হয়। যে ভক্তি ও বিশ্বাস নিয়ে ঈশ্বরকে স্মরণ করে, কৃষ্ণ তাকে নিজের দিকে টেনে নেন।

পঞ্চম অধ্যায় – সংন্যাস ও কর্মযোগের সমন্বয়

এই অধ্যায়ে কৃষ্ণ বলেন—“শুধু কাজ ত্যাগ করলে মুক্তি আসে না। প্রকৃত ত্যাগ হলো আসক্তি ত্যাগ।” যে ব্যক্তি সংসারে থেকেও মনে thinks—“আমি নই কর্তা, ঈশ্বরই কর্তা”—সে-ই সত্যিকারের যোগী। সংন্যাস মানে পৃথিবী ছেড়ে পালানো নয়; সংন্যাস মানে নিজের মনকে শুদ্ধ করে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে কাজ করা। যে সংসারে থেকেও নিজের মনকে ঈশ্বরচিন্তায় স্থির রাখতে পারে, সে-ই মুক্ত মানুষ।

ষষ্ঠ অধ্যায় – ধ্যানযোগ ও যোগীর শ্রেষ্ঠত্ব

এখানে কৃষ্ণ যোগের চূড়ান্ত রূপ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন—“যে ব্যক্তি ভক্তি ও একাগ্রতার সঙ্গে ঈশ্বরকে মনে করে, মনকে সংযত করে, ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখে, সে-ই যোগীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।” ধ্যানই যোগের প্রাণ। মনকে স্থির করে ঈশ্বরচিন্তায় লীন হলে, যোগীর চেতনা আলোকিত হয়, তার অন্তর থেকে ভয়, দ্বন্দ্ব ও দুঃখ বিলীন হয়ে যায়।

কৃষ্ণ আরও বলেন—মন অতি চঞ্চল, কিন্তু অনুশীলন ও বিরাগের মাধ্যমে তাকে শান্ত করা যায়। যে যোগী নিঃস্বার্থভাবে সকলের মঙ্গল চায়, যে ঈশ্বরকে ভালোবাসে এবং সকল জীবকে ঈশ্বরের প্রতিফলন হিসেবে দেখে—সে-ই প্রকৃত যোগী।

অংশ ৩ — সপ্তম থেকে দ্বাদশ অধ্যায়

ষষ্ঠ অধ্যায়ের শেষে অর্জুনের মন অনেকটাই স্থির হয়েছে। সে এখন বুঝতে শিখছে—কৃষ্ণ কেবল বন্ধু নন, তিনি পথপ্রদর্শক, জ্ঞানের আলোকধারা। তখন কৃষ্ণ আরও গভীর সত্য প্রকাশ করেন—সৃষ্টির রহস্য, ভক্তির শক্তি এবং ঈশ্বরের অসীম রূপ।

সপ্তম অধ্যায় – জ্ঞান ও ভক্তির সমন্বয়

কৃষ্ণ বলেন—“আমার জ্ঞান অসীম, আমার শক্তি সর্বত্র বিরাজমান। পৃথিবীর যা কিছু আছে—মাটি, জল, আগুন, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি ও অহংকার—সবই আমারই প্রকাশ।” তিনি জানান, এই জগতের প্রতিটি বস্তু তাঁর শক্তির অংশমাত্র। সবকিছুর উৎস, সব শক্তির মূল তিনি নিজেই।

যে মানুষ সত্য জানতে চায়, সে ভক্তির পথেই এগিয়ে যায়, কারণ ভক্তিই হলো ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর সহজতম উপায়। কৃষ্ণ বলেন, “যারা অন্য দেবতাকে ভজে, তাদেরাও আসলে আমাকেই ভজে—যদিও তারা তা জানে না। কারণ সকল পূজার লক্ষ্য একটিই—পরম সত্তা।”

অষ্টম অধ্যায় – মৃত্যু ও আত্মার যাত্রা

এই অধ্যায়ে কৃষ্ণ ব্যাখ্যা করেন মৃত্যু ও আত্মার প্রকৃত রহস্য। তিনি বলেন—“যে মানুষ মৃত্যুর সময় ঈশ্বরকে স্মরণ করে, সে ঈশ্বরের ধামে পৌঁছে যায়।” জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই তাই ঈশ্বরস্মরণ প্রয়োজন, যাতে শেষ সময়েও তাঁর নাম মনে থাকে। কৃষ্ণ বলেন—জন্ম ও মৃত্যু এক চক্রের মতো, যা অবিরত ঘুরে চলে। কিন্তু যে ভক্ত ঈশ্বরের স্মরণে থাকে, সে এই চক্র অতিক্রম করে চিরমুক্ত হয়।

নবম অধ্যায় – রাজবিদ্যা বা সর্বোচ্চ জ্ঞান

এখানে কৃষ্ণ জানান—ভক্তিই সেই সহজ পথ যা দিয়ে মানুষ তাঁকে লাভ করতে পারে। ভক্তি সরল, নিঃস্বার্থ, অহংকারহীন। কৃষ্ণ বলেন—“যদি কেউ আমাকে একটি ফুল, একটি পাতা, জল বা ফলও ভক্তিভরে দেয়, আমি তা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করি।” এই বাণীর অর্থ গভীর—ঈশ্বরের কাছে কোনো বস্তু বড় বা ছোট নয়; আসল মূল্য ভক্তির হৃদয়ে। তিনি বলেন, “যে আমার কাছে আসে, আমি তাকে গ্রহণ করি। সে পাপী হোক বা পূণ্যবান, নিম্ন জাতি বা উচ্চ, নারী বা পুরুষ—ভক্ত হলে সকলেই মুক্তি পায়।”

দশম অধ্যায় – ঈশ্বরের ঐশ্বর্য

এই অধ্যায়ে কৃষ্ণ তাঁর ঐশ্বর্য প্রকাশ করেন। তিনি বলেন—“জগতে যা কিছু শ্রেষ্ঠ, মহৎ ও সুন্দর, সবই আমার প্রকাশ।” পর্বতের মধ্যে তিনি হিমালয়, নদীর মধ্যে গঙ্গা, অস্ত্রের মধ্যে বজ্র, ঋষিদের মধ্যে নারদ, যোদ্ধাদের মধ্যে অর্জুন—সবই তাঁরই প্রতিফলন। যে ভক্ত আমাকে এইভাবে দেখে, তার মনে সর্বদা আমার স্মরণ থাকে।

একাদশ অধ্যায় – বিশ্বরূপ দর্শন

এই অধ্যায় গীতার অন্যতম গৌরবময় মুহূর্ত। অর্জুন কৃষ্ণকে বলেন—“আমি আপনার ঐশ্বর্য শুনেছি, কিন্তু দেখতে চাই আপনার প্রকৃত বিশ্বরূপ।” তখন কৃষ্ণ তাঁকে দিব্য দৃষ্টি দেন। অর্জুন দেখি—অসীম মহাবিশ্ব এক দেহে ধারণ করা, অগণিত রূপ, আলো, রং, ভয় ও সৌন্দর্যের এক অনন্ত দৃশ্য। তিনি দেখেন কোটি কোটি মুখ, অসংখ্য হাত, দেবতারা কৃষ্ণের মধ্যে প্রবেশ করছে, অসুরেরা তাঁর ভয়ঙ্কর রূপে ধ্বংস হচ্ছে। সূর্য ও চন্দ্র তাঁর দুই চোখ, আকাশ তাঁর দেহ, আর সমস্ত সৃষ্টি তাঁর মধ্যেই লীন। অর্জুন স্তম্ভিত হয়ে যান এবং প্রণাম করে ক্ষমা চান। কৃষ্ণ বলেন—“এই রূপ সহজে দেখা যায় না। কেবল ভক্তিই এই রূপ উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।”

দ্বাদশ অধ্যায় – ভক্তির মাহাত্ম্য

এ অধ্যায়ে অর্জুন জিজ্ঞেস করেন—“যে নিরাকার ব্রহ্মে বিশ্বাস করে, সে কি শ্রেষ্ঠ, না যে সাকার ঈশ্বরকে ভজে?” কৃষ্ণ উত্তর দেন—“উভয় পথেই মুক্তি সম্ভব, তবে নিরাকার উপলব্ধি করা কঠিন, কারণ তা মন ও ইন্দ্রিয়চক্ষে ধরা দেয় না। কিন্তু সাকার ঈশ্বরকে ভজলে সহজেই প্রেম ও ভক্তি জন্মায়।” তিনি বলেন—“যে ভক্ত প্রেমভরে আমাকে স্মরণ করে, সেবা করে, আমার নাম জপ করে, সে-ই আমার প্রিয়।” এবং ভক্তের লক্ষণগুলোও ব্যাখ্যা করেন—অহংকারহীনতা, ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য, সর্বজনীন প্রেম ও স্থিরচেতনাই সত্যিকারের ভক্তকে চিহ্নিত করে।

অংশ ৪ — ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ অধ্যায় ও সারমর্ম

ত্রয়োদশ অধ্যায় – ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ

এই অধ্যায়ে কৃষ্ণ আত্মা ও দেহের প্রকৃত সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন—“এই দেহ হলো ক্ষেত্র, আর যে আত্মা এই দেহে বাস করছে, সে হলো ক্ষেত্রজ্ঞ।” দেহ পরিবর্তনশীল, নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু আত্মা চিরন্তন, অবিনশ্বর এবং সেই দেহের সাক্ষীমাত্র। কৃষ্ণ জানান—“ঈশ্বরই সর্বক্ষেত্রজ্ঞ, তিনি প্রতিটি জীবের অন্তরে বিরাজমান।” যে মানুষ এই সত্য উপলব্ধি করতে পারে, সে মুক্ত হয়, কারণ তখন সে বুঝতে পারে—“আমি দেহ নই, আমি আত্মা।”

চতুর্দশ অধ্যায় – প্রকৃতির তিন গুণ

কৃষ্ণ এখানে বলেন—প্রকৃতিতে তিনটি গুণ বিরাজ করে—সত্ত্ব, রজ ও তম। সত্ত্বগুণ আলো, জ্ঞান ও শান্তি দেয়; রজগুণ আকাঙ্ক্ষা, কামনা ও কর্মে উদ্দীপ্ত করে; আর তমগুণ জন্ম দেয় অন্ধকার, অলসতা ও অজ্ঞতা। এই তিন গুণেই জগৎ আবদ্ধ, কিন্তু যে ভক্ত ভগবানের স্মরণে থাকে, সে এই তিন গুণ অতিক্রম করে মুক্ত হয়। তিনি বলেন—“যে সুখে-দুঃখে সম থাকে, সম্মান-অপমানে স্থির থাকে, যে ঈশ্বরনিষ্ঠ ও নিঃস্বার্থ—সেই ভক্ত তিন গুণের ঊর্ধ্বে উঠে মুক্তি লাভ করে।”

পঞ্চদশ অধ্যায় – পুরুষোত্তম যোগ

কৃষ্ণ বলেন—“এই জগতকে একটি উল্টো গাছের মতো ভাবা যায়, যার মূল উপরে, আর শাখা-প্রশাখা নিচে ছড়ানো।” এই গাছের মূল হচ্ছে ঈশ্বর, আর নিচের দিকটা হলো ক্ষণস্থায়ী সংসার। যে মানুষ এই গাছের সঙ্গে আসক্ত হয়, সে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু যে ভক্ত ঈশ্বরকে স্মরণ করে, সে মূল পুরুষোত্তমকে লাভ করে—সেই সর্বোচ্চ ধামকে, যেখানে আর কোনো জন্ম বা মৃত্যু নেই।

ষোড়শ অধ্যায় – দেবী ও অসুরী প্রকৃতি

এই অধ্যায়ে কৃষ্ণ মানুষে দুই প্রকৃতি বোঝান—দেবী ও অসুরী। দেবী প্রকৃতির মানুষের মধ্যে থাকে ভয়শূন্যতা, সত্যবাদিতা, আত্মসংযম, দান, করুণা ও নম্রতা। অন্যদিকে, অসুরী প্রকৃতির মধ্যে থাকে অহংকার, লোভ, হিংসা ও ভ্রষ্টাচার। কৃষ্ণ বলেন—“দেবী গুণ মানুষকে মুক্তির দিকে নিয়ে যায়, আর অসুরী গুণ তাকে বন্ধনে ফেলে।” অতএব, মানুষকে নিজের গুণ ও প্রবৃত্তির ওপর নিরন্তর নজর রাখতে হবে।

সপ্তদশ অধ্যায় – শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস

এখানে কৃষ্ণ ব্যাখ্যা করেন—মানুষের বিশ্বাস যেমন, সে তেমনই হয়ে ওঠে। সত্ত্বগুণী মানুষ দেবতার পূজা করে, রজগুণী মানুষ শক্তি ও ভোগের দেবতার উপাসনা করে, আর তমগুণী মানুষ অন্ধকার শক্তির পূজা করে। তাই ভক্তি ও বিশ্বাস সর্বদা শুদ্ধ, নিঃস্বার্থ ও সত্যনিষ্ঠ হওয়া প্রয়োজন। যে ভক্ত স্বার্থ ছাড়াই ভগবানের স্মরণে থাকে, সে-ই প্রকৃত ভক্ত।

অষ্টাদশ অধ্যায় – ত্যাগ, ধর্ম ও চূড়ান্ত উপদেশ

গীতার শেষ অধ্যায়ে কৃষ্ণ পূর্বের সব শিক্ষার সমন্বয় ঘটান। তিনি বলেন—“ত্যাগ মানে কাজ ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং আসক্তি ছেড়ে কর্তব্য পালন করাই আসল ত্যাগ।” একজন সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করলেও যদি মনে করে—‘আমি নই কর্তা, এটা ঈশ্বরের ইচ্ছা’—তবে সেই কর্মই ত্যাগময় কর্ম। কৃষ্ণ আরও বলেন, মানুষের স্বভাব অনুযায়ী তার কর্তব্য নির্ধারিত হয়—কেউ জ্ঞানচর্চায় ব্রাহ্মণের মতো, কেউ রক্ষায় ক্ষত্রিয়ের মতো, কেউ ব্যবসা বা কৃষিতে বৈশ্যের মতো, কেউ সেবায় শূদ্রের মতো কাজ করে। এগুলো জাতি নয়, প্রকৃতি ও প্রবৃত্তির পরিচায়ক।

কৃষ্ণ জানান—“যে-ই হোক, যদি নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের কর্তব্য পালন করে এবং ঈশ্বরের স্মরণে থাকে, তবে মুক্তি নিশ্চিত।” অর্জুন তখনও কিছুটা দ্বিধায়, কিন্তু কৃষ্ণ দৃঢ় কণ্ঠে বলেন—“এই যুদ্ধ থেকে পিছু হটবে না, অর্জুন। কারণ এ শুধু রাজ্য দখলের যুদ্ধ নয়, এটি ধর্মরক্ষার যুদ্ধ। যদি তুমি ভয়ে পিছিয়ে যাও, তবে সমাজ তোমাকে কাপুরুষ বলবে, আর তোমার আত্মাও শান্তি পাবে না।”

শেষে কৃষ্ণ সেই অমর উপদেশ দেন, যা গীতার হৃদয়:

“সব ধর্ম ও কর্তব্য আমাকে সমর্পণ করো। আমার স্মরণে থাকো। আমি তোমার সব পাপ মোচন করব। তুমি ভয় করো না।”
এই বাণী ভক্তির চূড়ান্ত মর্ম—মানুষ যতই জ্ঞান বা কর্ম অর্জন করুক, শেষ পর্যন্ত তাকে ঈশ্বরের শরণেই যেতে হয়। ভক্তি ছাড়া মুক্তি অসম্পূর্ণ।

এই কথা শুনে অর্জুনের মোহ কেটে যায়। সে বলে—“হে কৃষ্ণ, আমার বিভ্রান্তি দূর হয়েছে। আমি স্থির, আমি যুদ্ধ করব।” তার অন্তরে আর কোনো দ্বিধা থাকে না। সে বুঝে যায়—কৃষ্ণই চিরন্তন সত্য, আর ধর্মরক্ষা করাই তার কর্তব্য।

গীতার সারমর্ম

যদি গীতার সমগ্র শিক্ষা এক বাক্যে ধরা হয়, তবে বলা যায়—মানুষকে সর্বদা নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে, কিন্তু ফলের প্রতি আসক্তি ছাড়তে হবে। দেহ নশ্বর, আত্মা অক্ষয়। সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, জয়-পরাজয়—সবকিছুকে সমভাবে দেখতে হবে। জ্ঞান মানুষকে মুক্তির পথে নিয়ে যায়, কিন্তু জ্ঞানকে কর্মের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হয়। আর সর্বোচ্চ পথ হলো ভক্তি, কারণ ভক্তিই মানুষকে সরাসরি ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে দেয়।

ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান, তিনিই সৃষ্টির মূল ও লয়। তাঁর প্রতি ভক্তিভরে স্মরণ, প্রেম ও আত্মসমর্পণই হলো জীবনের চূড়ান্ত মুক্তি। আজও যখন জীবনে বিভ্রান্তি আসে, মন অশান্ত হয়, পথ হারিয়ে ফেলি—গীতা তখন আমাদের সেই আলোর দিশা দেখায়। যে মন গীতার উপদেশ হৃদয়ে ধারণ করে, তার জীবন আর আগের মতো থাকে না।

রাধে রাধে 🌺 • জয় শ্রীকৃষ্ণ